কবি গুরুর মৃত্যু শোক ও যন্ত্রণা : এমদাদুল হক চৌধুরী

| সোমবার, আগস্ট ৭, ২০১৭, ৮:১৫ অপরাহ্ণ

কলকাতার জোড়াসাকোঁর বিখ্যাত জমিদার পরিবারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম। পিতা মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাতা সারদাসুন্দরী দেবী। তের ভাই বোনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। আর এ কারণেই হয়তো একে একে স্বজনদের মৃত্যুশোক দেখতে হয়েছিল তাঁকে। ১৩ ভাই-বোন, কাকা-কাকি’র বিশাল পরিবারটিতে সুখ-সমৃদ্ধির কোন কমতি ছিল না। হাসি-আনন্দ, সুখ-সমৃদ্ধিতে সর্বদাই সরগরম থাকতো এই জমিদার পরিবারটি। একে একে সব ভাই-বোনের বিবাহ বন্ধনে আলাদা হয়ে গেলেও পারিবারিক বন্ধন ছিল বেশ মজবুত। সকলের মাঝে একটা হৃদ্যতা সর্বদাই বিরাজমান থাকতো।

১৮৭৫ সালে মাতা সারদাসুন্দরী দেবীর মৃত্যু হয়। তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল মাত্র সাড়ে তেরো বছর। পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন ছিলেন হিমালয়ে। স্ত্রীর অসুস্থতার খবর শুনে তরিঘড়ি করে কলকাতায় ফিরে আসেন। সে রাতেই স্ত্রীর মৃত্যু হয়। অতটুকু বয়সে মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হলেন। মাতৃশোকের মধ্য দিয়েই রবীন্দ্রনাথের বেড়ে ওঠা। রবীন্দ্রনাথ বুঝলেন মা আর ফিরে আসবে না কোন দিন। জীবনের প্রথম সবচেয়ে আপনজনের মৃত্যু শোক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনুভব করলেন ভীষণভাবে। এই মৃত্যুশোক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনে কোনদিন ভুলতে পারেননি। বড় হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন, “বড় হইলে যখন বসন্ত প্রভাতে একমুঠা অনতিস্ফুট মোটা মোটা বেলফুল চাদরের প্রান্তে বাঁধিযা খ্যাপার মত বেড়াইতাম, তখন সেই কোমল চিক্কন কুঁড়িগুলো ললাটের উপর বুলাইয়া প্রতিদিনই আমার মায়ের শুভ্র আঙুলগুলি মনে পড়িত; আমি স্পষ্টই দেখিতে পাইতাম, যে স্পর্শ সেই সুন্দর আঙুলের আগায় ছিল সেই স্পর্শই প্রতিদিন এই বেলফুলগুলির মধ্যে নির্মল হইয়া ফুটিয়া উঠিতেছে।” (ভারত বিচিত্রা, মে-২০১৫)

১৮৮৩ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করলেন যশোরের মেয়ে ভবতারিণী দেবীর সাথে। তখন ভবতারিণীর বয়স ছিল মাত্র সাড়ে নয় বছর। ভবতারিণী নামটি তাঁর পছন্দ না হওয়ায় তিনি নামটি পাল্টিয়ে, নতুন নাম রাখেন মৃণালিনী দেবি। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী হিসেবে তিনি এ নামেই পরিচিত সর্বমহলে। যাহোক, বিয়ের এ আনন্দ-উৎসবের মাঝে খবর এলো শিলাইদহে বড় ভগ্নিপতি সারদাপ্রসাদের মৃত্যু সংবাদ। থেমে গেলো আনন্দ-উৎসব। বিয়ের অনুষ্ঠানে নেমে এলো শোকের ছায়া। এ শোক কাটতে না কাটতেই মাত্র সাড়ে চার মাসের মাথায় বড় দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যা। এই বড় বৌদি কাদম্বরী দেবী ছিল রবীন্দ্রনাথের বাল্য সখি। কিশোর বয়সে এই কাদম্বরী দেবীর সাথে রবীন্দ্রনাথের মন দেয়া-নেয়ার সম্পর্ক ছিল এবং সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে, দেবর রবীন্দ্রনাথের বিয়ে বড় বৌদী কাদম্বরী দেবী কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি, ফলশ্রুতিতে বিয়ের মাত্র সাড়ে চার মাসের মাথায় কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করে। কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যা রবীন্দ্রনাথকে ভীষণভাবে আহত করে। কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তায় গভীর রেখাপাত করে। কবি তাঁর লেখায় ও কবিতায় সে মুত্যুশোক নানাভাবে তুলে ধরেছেন। বড় বৌদি কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর দেড় মাসের মাথায় মারা যায় মেজদাদা হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

এরপর ১৯০০ সালে মারা যায় কবির সবচেয়ে স্নেহধন্য ভাইপো বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবির কুষ্টিয়ার শিলাইদহে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘টেগোর এন্ড কোম্পানী’ দেখাশুনার দায়িত্ব ছিল ভাইপো বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের। বলেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় রবীন্দ্রনাথ ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন।

১৯০৫ সালে পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পরলোকগমন করেন কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে। বাবার মৃত্যুতে কবি ভীষণভাবে মুষড়ে পড়েন। তারপরও লেখা-লেখি ও শান্তিনিকেতনের কাজ চালাতে থাকেন সমানতালে।

রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন ৪১, তখন স্ত্রী মৃণালিনী দেবী ১৯০২ সালে ৩ কন্যা ও ২ পুত্র রেখে মারা যান। প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারিয়ে কবি অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়লেন। এত শোকের মাঝেও কবি অবসর নিলেন না কাজ থেকে। একদিকে কুষ্টিয়ার শিলাইদহের জমিদারী অপরদিকে শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার কাজ।

পুত্র দু’টির নাম যথাক্রমে ১. শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২. রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কন্যা তিনটির নাম যথাক্রমে ১. মাধুরী লতা বা বেলা, ২. রেণুকা বা রাণী ৩. মীরা বা অতশী।

স্ত্রীর মৃত্যুর পর রেণুকা খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার ত্রুটি করলেন না। এই মেয়ের বিয়ে হয় সতেন্দ্রনাথ রায়ের সাথে। জামাতাকে বিলেতে পাঠিয়েছিলেন ডাক্তারী পড়াতে। শেষ পর্যন্ত ডাক্তারী কমপ্লিট না করেই দেশে ফিরে আসেন। শেষ চেষ্টা করেও রেণুকা বা রাণীকে বাঁচানো যায়নি। রেণুকা মারা যায় ১৯০৩ সালে। রেণুকা মারা যাওয়ার ৪ বছর পর অর্থাৎ ১৯০৭ সালে মারা যায় কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শমীন্দ্রনাথ মুঙ্গেতে বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। দ্রুত ছুটে যান মুঙ্গে কিন্তু তার আগে জগৎ সংসার থেকে শমীন্দ্র বিদায় নেন। শোকার্ত কবি শোক থেকে ভুলে থাকার জন্য লিখতে থাকেন সমানতালে।

কবি গুরুর আদুরে মেয়ে মাধুরী লতা ওরফে বেলার বিয়ে দেন কবি বিহারী লালের পুত্র শরৎচন্দ্রের সাথে। বিয়ের পর জামাতাকে ব্যারিস্টারী পড়ানের জন্য বিলেতে পাঠিয়েছিলেন। ব্যারিস্টারি শেষ করে এসে মেয়ে ও জামাতা ওঠেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে। ছোট জামাতা নগেন্দ্রর সাথে বনিবনা না হওয়ায় জড়িয়ে পড়েন বিবাদে। স্ত্রী মাধুরী লতাকে নিয়ে জোড়াসাঁকো থেকে পৈত্রিক নিবাস শ্রীরামপুরে চলে আসেন রাগ করে। এরপর জামাতা শরৎচন্দ্রের সাথে কবি গুরুর সম্পর্কের ইতি ঘটে। স্বামীর বাড়ি শ্রীরামপুরে যেয়ে মাধুরীলতার অসুখও বেড়ে যায়। প্রতিদিন গাড়িতে করে কন্যাকে দেখতে শ্রীরামপুরে যেতেন কবি গুরু। একদিন জামাতা শরৎচন্দ্র শশুরের সামনে টেবিলের উপর পা রেখে সিগারেট ফুঁকাতে থাকেন এবং অপমানকর মন্তব্য করেন। কন্যা স্নেহে কাতর এই বিশ্ববরেণ্য কবি এত অপমান সহ্য করেও প্রতিদিন কন্যাকে দেখতে যেতে কোন কার্পন্য করেননি। একদিন পথিমধ্যে শুনলেন কন্যার মৃত্যু হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ আর সামনে অগ্রসর হলেন না। কন্যাকে শেষ দর্শন বা মৃত্যুমুখ না দেখেই ফিরে এলেন বাড়িতে। পুত্র রথিন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, বাবা স্বজন হারানোর শোকে শোকে এতটাই অভ্যস্ত হয়েছেন যে, স্বজনের মৃত্যুতে কবির চেহারায় এখন আর কোন শোকের চিহ্ন পরিদৃষ্ট হয় না। স্বাভাবিকভাবেই তিনি বাড়িতে আসলেন, সবার সাথেই হাসিমুখে কথা বললেন, খাওয়া-দাওয়া করলেন। দেখে মনেই হচ্ছে না, তাঁর প্রাণপ্রিয় স্নেহের কন্যা পরলোকগমণ করেছে। যাহোক, এ জামাতা নগেন্দ্রকেও তিনি আমেরিকায় পাঠিয়েছিলেন কৃষিবিদ্যায় উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য। জামাতা নগেন্দ্রও কবি গুরুকে কম কষ্ট দেননি। আমেরিকায় যেয়ে বার বার টাকা চেয়ে শশুরের কাছে চিঠি লিখতে থাকে। শেষ পর্যন্ত রবিন্দ্রনাথ জামাতাকে বলেন, জমিদারীতে থেকে যে টাকা আমি পাই তার সম্পূর্ণটাই আমি তোমাকে দেই। এ মেয়েও বেশিদিন স্বামীর সান্নিধ্য ও ভালবাসা পাননি। নগেন্দ্র আমেরিকা থেকে আসার অল্পকিছুদিনের মধ্যেই মীরা মারা যায়। মীরার মৃত্যুর পর নগেন্দ্র খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করে ধর্মান্তরিত হয়। এভাবে একে একে সকল আপনজনকে হারিয়ে এবং মৃত্যুশোক ভুলে থাকার জন্য রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের নানা কাজে নিজেকে ব্যস্ত করে তুলেন।

মীরার ছেলে নিতেন্দ্রকে প্রকাশনা শিল্পে উচ্চ শিক্ষার জন্য জার্মানীতে পাঠান। সেখানে ১৯৩২ সালে রবীন্দ্রনাথের প্রিয় দৌহিত্র নিতু মাত্র ২০ বছর বয়সে মারা যায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর এই দৌহিত্রকে খুবই স্নেহ করতেন। নিতুর মৃত্যুতে কবি এক চিঠিতে লিখেছিলেন, “কিছুকাল থেকে আমি আছি মৃত্যু ছায়ায় ডুবে। নিতুর বই, তার কাপড়, তার জিনিসপত্র এসে পৌঁছেছে। যে নিজে চলে যায়, সে যা কিছু ফেলে যায় তাতে তার বিচ্ছেদকে আরও দুঃসহ করে তোলে-সংসারের সমস্ত আয়োজনকে কী ফাঁকি বলেই মনে হয়!” (ভারত বিচিত্র, সংখ্যা মে-২০১৫)

১৯২৫ সালে পঞ্চম দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ রাঁচিতে এবং ১৯২৬ সালে বড় দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুশোকে হতবিহ্বল কবি একে একে স্বজন হারানোর শোক বহন করে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছান। হাজারো শোকের মাঝে কবি তাঁর সৃষ্টিকর্ম থেকে হাত গুটিয়ে নেননি। অবিরাম লিখে চলেছেন কালজয়ী গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও নাটক। কবির এই কালজয়ী সৃষ্টির জন্য বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে অমর হয়ে থাকবেন।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মারা যান ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট ৮০ বছর বয়সে। কবি গুরুরও মৃত্যু যন্ত্রনা কম ছিল না। দীর্ঘ দিন থেকে কবি গুরু মূত্রনালী সমস্যায় ভুগছিলেন। কবি গুরুকে মূত্রনালীর পাথর অপসারণের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করাতে চাইলে কবি গুরু অস্বীকৃতি জানান। ফলে, জোড়াসাঁকোতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নিয়ে এসে বিনা এ্যানেসথেসিয়ায় কবির মূত্রনালী অপারেশন করা হয়। এই বিনা এ্যানেসথিয়া অপারেশনে কবিকে যে কি নিদারুণ কষ্টই না সহ্য করতে হয়েছিলো! সপ্তম দিনের মাথায় অপারেশনের জায়গায় ইনফেকশন দেখা দেয়। অপারেশনের ১৫ দিনের মাথায় কবিকে সীমাহীন কষ্ট আর যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে পরলোকগমন করতে হয়। শক্ট করে কবির শবদেহ যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন কবির ভক্তরা মাথার চুল শ্রদ্ধার সাথে সংরক্ষণের জন্য ছিড়ে নিয়ে যায়। শশ্মানে শব দেহ আনা হলে কবির একমাত্র পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি কারণে যেন কবির মুখাগ্নি দিতে পারেনি। দূর সম্পর্কের এক নাত্নী এসে কবি গুরুর মুখাগ্নি দেয় বলে যানা যায়।

দৃঢ় মনোবল ও বিরাট কর্মযজ্ঞ দিয়ে তিনি সকল শোককে জয় করতে পেরেছিলেন। সুদীর্ঘ জীবনে আপনজন হারানোর শোক কবিকে কাতর করেছে ঠিকই, কিন্তু কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টিতে তা কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।

লেখক : ইতিহাস গবেষক

e-mail : emdadulbd636@gmail.com

Bangalnama/বাঙালনামা/এসএ

Please follow and like us:
0