এক সাগর রক্তের বিনিময়ে | কেয়া চৌধুরী

| শনিবার, মার্চ ২৫, ২০১৭, ৬:৪৯ পূর্বাহ্ণ
কেয়া চৌধুরী

স্বাধীনতার এত বছর পর একাত্তরের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা দিবসটিকে ‘জাতীয়ভাবে গণহত্যা দিবস’ হিসেবে প্রথমবারের মতো আজ দেশব্যাপী পালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভয়াল বিভীষিকাময় গণহত্যার কালোরাত্রি ২৫শে মার্চকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিকভাবে গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতির আদায়ের পথ সুগম হলো। একাত্তরে পাকিস্তানিদের ‘গণহত্যা’ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের এ পদক্ষেপ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদদের আত্মত্যাগকে স্বীকৃতি দেয়ার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
 
ইতিহাস থেকে জেনেছি, বঙ্গবন্ধুর ৬৬’র ৬ দফার প্রতি সমর্থন জানিয়ে, ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজ্যের জনগণের বিপুল সর্মথন নিয়ে আওয়ামী লীগ জয়যুক্ত হয়। সরকার গঠন করার পূর্ব-মুহূর্তে পাকিস্তান পিপলস পার্টি যে সড়যন্ত্রের নিল নকশা প্রণয়ন করেছিল তার বহিঃপ্রকাশ ছিল, ২৫শে মার্চ গণহত্যা। শান্তিপূর্ণ আলোচনার নামে, জেনারেল ইহাহিয়া খান এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর ষড়যন্ত্রের রক্তাক্ত ইতিহাস উঠে এসেছে, সেই সময়ের একাধিক সামরিক কর্মকর্তার লেখা বিভিন্ন বইয়ে। ২৫শে মার্চ কালোরাত্রি; এটি যে পূর্ব পরিকল্পিত। তার বর্ণনা পাওয়া যায় ইয়াহিয়া খানের জনসংযোগ বিষয়ক কর্মকর্তা সাদিক সালিকের ‘উইথনেস টু সালেন্ডার’ বইয়ে।
 
২৫শে মার্চ রাত্রের ‘অপারেশন সার্চ লাইটে’র মূল লক্ষ্য ছিল, মানুষ হত্যা করা। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর নজিরবিহীন এই গণহত্যা কতটা সুপরিকল্পিত ছিল, তা উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ড. এমএ হাসানের ‘১৯৭১; গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ’ বইটিতে। এই বইয়ের ১৯ পৃষ্ঠায়, ৭১ এর গণহত্যার পাকিস্তানের অনেক জেনারেলদের বইয়ের উদ্ধৃতি থেকে উঠে আসা তথ্য থেকে জানা যায়, ২৫শে মার্চ গণহত্যার নীলনকশা ঢাকায় অবস্থিত সেই সময়ের জিওসি’র অফিসে প্রাথমিকভাবে প্রণীত হয়। নীল কাগজের উপর পেনসিল দিয়ে এই প্রাথমিক খসড়াটির পূর্ণাঙ্গ রূপ আসে; জেনারেল ফরমান আলীর হাত ধরে। তারপর ২০শে মার্চ ১৯৭১ সালে, ১৬ প্যারার ৫ পৃষ্ঠার ‘অপারেশন সার্চ লাইটে’র চূড়ান্ত পরিকল্পনা অনুমোদন পায় জেনারেল টিক্কা খান ও জেনারেল হামিদের হাত ধরে। এই অপারেশনের সর্বাধিনায়ক, জেনারেল ইয়াহিয়া খানের চূড়ান্ত অনুমোদনের মধ্য দিয়ে, নিশ্চিত হয় ৩০ লাখ নিরীহ বাঙালির অনন্ত যাত্রার রক্তাক্ত ইতিহাস।
 
৭১ এর ২৫শে মার্চ গণহত্যা কতটা বিভীষিকাময় ও রক্তাক্ত ছিল, তা উঠে এসেছে, রশিদ হায়দাারের সম্পাদিত ‘৭১-এর ভয়াল অভিজ্ঞতা বইয়ে’ ২৫শে মার্চে রাত্রে, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নুরুল উল্লার বয়ানে, উঠে আসা জগন্নাথ হলে পাকিস্তানির হানদার বাহিনীর দ্বারা ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারীকে অত্যাচার করে দফায়, দফায় হত্যা করার ভয়াল অভিজ্ঞতার কথা। এই কালো রাতে বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন নৃশংসতায় হত্যা করা হয়েছিল, ৫০ থেকে ৬০ হাজার নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালিকে, ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নাম দিয়ে।
 
নিরস্ত্র, নিরপরাধ, ঘুমন্ত মানুষকে হত্যার হোলি খেলার বিবরণ উঠে এসেছিল, ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিংয়ের ‘লন্ডন ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এর প্রতিবেদনে। এখানে উঠে আসে, তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকবাল হল, জগন্নাথ হল, রোকেয়া হলে, কিভাবে তল্লাশির নামে গুলি করে বেয়নেট খুঁচিয়ে, ধর্ষণ করে, নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যযজ্ঞ চালায়।
‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইটিতে পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তা সাদিক সালিকের দেওয়া বর্ণনায়, উঠে আসে ২৫শে মার্চ রাতভর নৃৃশংস গণহত্যার ভয়াবহতা । এ যেন এক লাশের নগরী ঢাকা শহর।
 
একাত্তরের ২৫শে মার্চ কোনো যুদ্ধ ছিল না । কিন্তু এই অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনাকে সার্থক করতে ইয়াহিয়া, ভুট্টো, চট্টগ্রাম বন্দরে সমরাস্ত্র ভর্তি জাহাজ ভিড়িয়েছে। ২৩শে মার্চের পর থেকে, হাজারে-হাজারে সাদা পোশাকের পাকসৈন্য নামিয়েছে পূর্ব-বাংলায়। একদিকে, ২৩শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে, লাল-সবুজ আর হলুদ রঙ্গের উজ্জ্বল পতাকা ঢাকার বাড়িতে- বাড়িতে, অলিতে-গলিতে পত্‌ পত্‌ করে উড়ছিল; ঠিক সেই সময়, পাকিস্তানি জান্তা ‘জেনারেল ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুর উদেশ্য বলেছিল ‘৬ দফার কাটছাঁট করতেই হবে। নয়’তবা অ্যাকশন, অর্থাৎ গণহত্যা’। বীরের বেশে বঙ্গবন্ধু সেদিন, প্রতিউত্তরে বলেছিলেন, ‘৬ দফায় কোনো আপস নয়। আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ ম্যান্ডেট পেয়েছে, ৬ দফা অনুসারে শাসনতন্ত্র রচিত হবে। দরকার হলে একদফা দেবো। অর্থাৎ স্বাধীনতার লড়াই’। (এম আর আক্তার মুকুলের ‘চরমপত্র’)
 
সর্বশেষ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, একাত্তরের ২৫শে মার্চ গণহত্যাকে পাকিস্তানের কৃতকর্মকে অস্বীকার করে, উল্টো মুক্তিবাহিনীর উপর চাপানোর চেষ্টায়, সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের প্রপাগান্ডায় জুনাইদ আহম্মেদের লেখা ক্রিয়েশন অফ বাংলাদেশ’: মিথস এক্সপ্লোডেড নামে বই। আইএসআইয়ের অর্থায়নে জুনাইদ আহম্মেদ রচিত এই বিকৃত ইতিহাসের বইটি পাকিস্তানে অবস্থিত বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দূতাবাসে প্রেরণ করা হয়। এই মিথ্যাচার সংবলিত বই ছাপিয়ে পাকিস্তান যে দুঃসাহস দেখিয়েছে, তার প্রতি তীব্র নিন্দা, ধিক্কার, আর প্রতিবাদ জানিয়েছেন গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি ১০ম জাতীয় সংসদের সকল সম্মানিত সংসদ সদস্য।
 
বঙ্গবন্ধু কন্যা সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে সকল মিথ্যাচারের অবসান ঘটিয়ে ২৫শে মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃতি আদায়ের প্রস্তাব আনেন। পরবর্তীতে, মহান সংসদে সংসদ সদস্য শিরিন আক্তারের আনীত ১৪৭ বিধির প্রস্তাবের ভিত্তিতে, ৩৫ জন সংসদ সদস্য বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সমর্থনে ৭১’র ২৫শে মার্চকে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের সমর্থন জানায় । যেখানে সর্বসম্মতিতে ৭১’র পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দ্বারা সংগঠিত গণহত্যাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃিত আদায়ের লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
 
এর মধ্যদিয়ে, মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার এক মহান ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দ্বারা ২৫শে মার্চ কালোরাত্রিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানাসহ গোটা ঢাকা শহরকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করার এই নীল-নকশার ইতিহাস, অনাগত নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে বাঙালির আত্মত্যাগ, বাঙালির বীরত্ব, বাঙালির সাহসিকতার মহান ইতিহাস উঠে আসবে।
 
একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নতুন একজন সংসদ সদস্য হিসেবে, ২৫শে মার্চ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের সমর্থনে বক্তব্য রাখতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেছি। দৃঢ়তার সাথে, বঙ্গবন্ধু কন্য জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলতে চাই, ঐতিহাসিকভাবে বাংলার জনগণ বঙ্গবন্ধুর কন্যার কাছে ‘বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীর বিচার’, ‘বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি’ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাযের্র যে মহান দায়িত্ব আপনার প্রতি বিশ্বস্ততা নিয়ে অর্পণ করেছিল তা আপনি আপনার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, বাস্তবায়ন করেছেন। বাংলার তরুণ সমাজ বিশ্বাস করে, এবার ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা দিবস বঙ্গবন্ধুর কন্যার হাত ধরেই আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি লাভ করবে। মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলতে চাই, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলবো না।
 
লেখক : সমাজকর্মী ও সংসদ সদস্য

Bangalnama/বাঙালনামা/এমজেড/এমএম

Please follow and like us:
0