কবিতা এক ধরনের উপাসনা : শামীম আরেফীন

| শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৭, ১০:১৪ অপরাহ্ণ

শামীম আরেফীন। একজন তরুণ কবি এবং গল্পকার। অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৭ তে প্রকাশ করেছেন তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কফিনভর্তি মেঘ’। কবির আগের দুই কাব্যগ্রন্থ ‘তৃতীয় চোখের কোরাস’ (২০১৫) এবং ‘মানুষ কেনো ফুলের নাম নয়’ (২০১৬)। প্রকাশিত বই এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বইমেলায় কথা বললেন বাঙালনামা’র সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওয়ালী উল্লাহ খান এবং তুহিন খান।

বাঙালনামা ● আপনার বইয়ের নামকরণ সম্পর্কে জানতে চাই :
শামীম আরেফীন ● বইয়ের নামকরণ করা আমার জন্য দুরূহ কাজ। পছন্দমত নাম পেতে অনেকদিন অপেক্ষাও করতে হয়। নতুন বইয়ে অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলোর সাথে ‘কফিনভর্তি মেঘ’ নামটি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়েছে বলেই এটা রেখেছি।
বাঙালনামা আপনার অন্য বইগুলো থেকে এই বইটির পার্থক্য কী? :
শামীম আরেফীন ● আমি প্রতিটি বইয়ে ভিন্নতা রাখার চেষ্টা করি। নির্মানে কিংবা নন্দনে। একই ফর্মেটে একটানা লিখে যেতে আমার একঘেয়ে লাগে। নিজেকে বারবার ভেঙে নতুন ছাঁচে নতুনভাবে আবিষ্কার করাও আমার নেশা। তবে তা নিজস্ব স্বর থেকে সরে গিয়ে নয়। তাছাড়া একটি বই থেকে অন্যটির যদি ভিন্নতা না থাকে তবে আমি মনে করি নতুন বই প্রকাশ করা অর্থহীন। এবারের বইটিতে অধিকাংশ কবিতাই টানা গদ্যে লেখা। এক প্রকার ঘোরগ্রস্ততার মধ্য দিয়ে লেখা কবিতাগুলো আমাকে নতুন এক জগত চিনিয়েছে। বাস্তব এবং পরাবাস্তব সময়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখেছি নতুনভাবে। তাই এই জার্নিটাও ছিলো উপভোগ্য।
বাঙালনামা ● সম্ভবত এ বছর আপনার গল্পের বই আসার কথা ছিলো । :
শামীম আরেফীন ● হ্যাঁ, গতবছর কবিতার বই আসার পর ভেবেছিলাম এ বছর গল্পের বই করব। কারণ, আমার গল্প এবং কবিতা লেখার শুরু প্রায় একই সাথে। এবং হাতে বেশ কিছু গল্পও জমে ছিলো। কিন্তু এক পর্যায়ে মনে হলো গল্পের বইয়ের জন্য নিজের প্রস্তুতি আরো মজবুত হওয়া দরকার। সে জন্যই সময় নিচ্ছি।
বাঙালনামা ● কবিতার পাঠক সংখ্যায় আপনি সন্তুষ্ট কিনা ? :
শামীম আরেফীন ● পাঠক নিয়ে আমার কোন সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি নেই। যাদের ভালো লাগবে বই কিনবে, পড়বে। ভালো না লাগলে পড়বে না। তবে পাঠকদের আগ্রহ পেলে ভালোলাগে। বরাবরই বলা হয়ে থাকে কবিতার পাঠক কম। কিন্তু এটা ঠিক নয়। কবিতার পাঠক কখনোই কম ছিলো না, বরং পর্যাপ্ত। শুধু বইমেলায় বিক্রিত বইয়ের সংখ্যা দিয়ে কবিতার পাঠক বিচার করাও সঠিক পদ্ধতি নয়। মানুষকে কবিতার কাছে আসতেই হয়। কবিতা এমনই এক নেশা, যাকে উপেক্ষা করা প্রায় অসম্ভব।
বাঙালনামা ● সমসাময়িক কবিতায় বাঁক বদল লক্ষ্য করা যায়। অনেকে দুর্বোধ্যতার অভিযোগও তোলেন। এ নিয়ে আপনার মতামত? :
শামীম আরেফীন ● বাঁক বদল হওয়াই যে কোন ভাষার সহজাত স্বভাব। দীর্ঘদিন এক ধারায় আটকে থাকলে ভাষা স্থবির হয়ে পড়ে। কবিতায়ও এর ব্যতিক্রম নয়। একেক সময়কার কবিতার ভাষা একেক ভঙ্গিমায় বাঁক নিয়ে থাকে। এই নতুন বাঁকের সাথে অভ্যস্ত হতে পাঠকের কিছুটা সময় লাগবেই। তখন সাময়িক দুর্বোধ্য মনে হতেও পারে। তবে নিয়মিত পাঠাব্যাস থাকলে এই সমস্যা থাকে না আর। অর্থাৎ কবিতা দুর্বোধ্য মনে হওয়াতে কবির কোন দায় নেই। বরং এটা পাঠকের দুর্বলতা। কবিতা লিখতে একজন কবি যেমন প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন, তেমনি পাঠকেরও কবিতার কাছে আসতে প্রস্তুতি দরকার। তবে কেউ যদি কবিতায় ইচ্ছেকৃত দুর্বোধ্যতার প্রাচীর তৈরি করে পাঠকদের বোকা বানাতে চান, সেটা ভুল। কবিতায় প্রবেশের পথ হাতে ধরে না দেখিয়ে দিলেও অন্তত এমন কোনো ট্রাক রাখা উচিত যেটা দেখে মেধাবী পাঠক সহজেই পথ খুঁজে পান।
বাঙালনামা ● পাঠ্যপুস্তকে সমসাময়িক কবিতা অন্তর্ভুক্ত না থাকাটাও কি এর কারণ ? :
শামীম আরেফীন ● হ্যাঁ। এটাও অন্যতম কারণ। পাঠ্যপুস্তক থেকেই সাধারণত পাঠাব্যাস তৈরি হয়। তো দেখা যায়, আমাদের দেশে পঞ্চম শ্রেণী থেকে ভার্সিটি পর্যন্ত পাঠ্যসূচিতে নির্দিষ্ট কিছু কবির কবিতাই ঘুরে ফিরে আসছে। সমসাময়িক কোনো কবিতা নেই। ফলে কবিতা সম্পর্কে সেই পুরাতন ধারণায় তারা অভ্যস্ত হয়ে থাকে এবং সময়ানুক্রমে কবিতার ধারা বদলের সাথে পরিচিত হতে পারে না। দীর্ঘ গ্যাপ পড়ে যায়। সেই গ্যাপ নিয়ে যখন সমসাময়িক কবিতা পড়তে যায়, তখন হোঁচট খায়। তাই আমি মনে করি, পাঠ্যপুস্তকেও কবিতার সূচি পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
বাঙালনামা ● সমসাময়িক যারা লিখছেন তাদের সম্পর্কে মূল্যায়ন কী ? :
শামীম আরেফীন ● এই সময়ে অনেকেই ভালো লিখছে। অনেকে ভালো লেখার চেষ্টা করছে। ভালোর তো আসলে নির্দিষ্ট মাপকাঠি নেই। আমি মনে করি, ভালো লেখার চেয়ে নতুন কিছু লেখাই বেশি জরুরি। ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে নতুন পথ তৈরি করতে হবে। দেখা যায়, অনেকে কবিতা পড়তে পড়তে এক সময় লেখালেখি শুরু করেন এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই হুট করে বই বের করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন। ফলে কবি হওয়ার নেশা তার সঠিক অগ্রগতিকে খানিকটা বাঁধাগ্রস্ত করে। এর জন্য ফেসবুক কেন্দ্রিক লেখালেখি অনেকটা দায়ী। এখানে ভুল মানুষদের সাজেশন খুব সহজলভ্য। কবিতা আসলে এক ধরনের প্রার্থনা বা উপাসনা। গভীর ধ্যান। দীর্ঘ সাধনা। কারো উৎসাহ অনুপ্রেরণা কবিতার পথে খুব বেশি কাজে লাগে না। যারা এই ধ্যান এবং সাধনাকে ভেতরে লালন করেন তারাই অনেক দূর যেতে পারেন। এই কথাগুলো আমি নিজেকেও বলি সব সময়।
বাঙালনামা ● আপনার কি মনে হয় ফেসবুক কেন্দ্রিক কবিতা আমাদের অনেক কাক-কবির জন্ম দিচ্ছে? :
শামীম আরেফীন ● কিছু মনে করবেন না, ‘কাক-কবি’ শব্দটা আমার পছন্দ নয়। যিনি কবি তিনি তো কবিই। আর যিনি কবিতার নামে আবর্জনা তৈরী করেন, তিনি কোন কবিই নন। সুতরাং এই উপমা অপ্রয়োজনীয়। ‘অকবি’ বলা যেতে পারে। সবকিছুর যেহেতু দুইটা দিক আছে, ভালো এবং মন্দ। ফেসবুকেও তেমন। ফেসবুকের কল্যানে অনেক শক্তিমান কবিদের সাথে সহজেই যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয়। যে কারণে পাঠকের কাছে তাদের সৃষ্টি খুব দ্রুত পৌঁছায়। সমসাময়িক কবিদের মধ্যে কে কেমন লিখছেন সেই খবরাখবরও রাখা যায়। এটা সুবিধাজনক। এটা ভালো দিক। তবে এর খারাপ দিক হলো, কবিতা না বোঝা অনেকেই লাইক-কমেন্ট-এর সংখ্যাধিক্যবলে খুব সহজেই জনপ্রিয় কবি (!) হয়ে ওঠে। যাদেরকে আপনি ‘কাক-কবি’ বললেন। ফলে কবিতার সুস্থ জায়গাটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাঙালনামা ● আপনার বইয়ের ফ্লাপে কবি পরিচিতিতে লেখা ‘কবিতা লেখার দীর্ঘ অপরাধ কাঁধে নিয়ে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন’। এখানে, কবিতা লেখাকে অপরাধ হিসেবে দেখার কারণ কী? :
শামীম আরেফীন ●  আমি যে পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ায় দাঁড়িয়ে কবিতা লিখছি তা এক ধরনের অপরাধের মতই। সমাজের একাংশ মানুষ এখনও কবি-সাহিত্যিকদের সঠিক দৃষ্টিতে দেখতে শেখেনি। তাছাড়া অনেক কিছু ত্যাগ করেই কবিতার কাছে আসা। কবিতা লিখে জীবিকা হয় না। একজন কবিকে কবিতাও লিখতে হয়, জীবিকার জন্যও ছুটতে হয়। কবিতা লেখা যদি অপরাধ না হতো, কবিতার জীবন এতোটা কঠিন হতো না।
বাঙালনামা ● কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পেলেন? :
শামীম আরেফীন ● কবিতাই আমার কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা। এর পেছনে নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি বা ঘটনা নেই।
বাঙালনামা ● এবারের মেলা কেমন দেখছেন ? :
শামীম আরেফীন ● এবারের মেলা প্রতিবারের মেলার মতই। তবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মেলা প্রাঙ্গন এতো বেশি বড় স্পেস নিয়ে করা, অর্ধেক গিয়ে হাফিয়ে উঠতে হয়। ফলে অনেক পাঠক মেলার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত না গিয়েই ফিরে আসে। স্পেস যতটুকু দরকার ততটুকুই দেয়া উচিত। বেশিও না, কমও না। মেলার সিকিউরিটি খারাপ না। তবে প্রবেশের সময় একজন লেখককেও যখন পা থেকে মাথা পর্যন্ত হাত দিয়ে সার্চ করা হয়, তখন বিব্রত লাগে। লেখকদের জন্য আলাদা পাস থাকলে এই অবস্থার সম্মুখিন হতে হতো না। অনেকে ফ্যামিলি নিয়ে মেলায় আসে। শিশু এবং বয়স্করাও থাকে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত বসার জায়গা নেই। খাবারেরও সু-ব্যবস্থা নেই। যা আছে নাম মাত্র এবং ব্যয়বহুল। তবে এবারের মেলায় সব স্টলের উপরে টিনের ছাউনি দেয়া হয়েছে, এটা ভালো ব্যাপার। ফেব্রুয়ারির বৃষ্টিতে প্রতিবছর অসংখ্য বই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবার সে আশংকা কম।

Bangalnama/বাঙালনামা/ডব্লিউকে

Please follow and like us:
0